
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার কাঠামোয় বড় পরিবর্তন আসছে
৬ জুন ২০২৬, ঢাকা: দেশের সবচেয়ে বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা— এসএসসি ও এইচএসসির সময় কমিয়ে আনা এবং শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে মানসিক চাপ কমাতে বড় ধরনের সংস্কারের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। বিদ্যমান শিক্ষাক্রমের আওতায় পরীক্ষার বিষয় সংখ্যা যৌক্তিকীকরণ এবং পরীক্ষা গ্রহণের কর্মদিবস উল্লেখযোগ্য হ্রাসের প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। এই প্রস্তাব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুমোদনের জন্য পেশ করা হয়েছে।
NCTB কনসেপ্ট পেপার ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড একটি কনসেপ্ট পেপার ও অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করেছে। এতে পরীক্ষার বিষয় যৌক্তিকীকরণ এবং এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা গ্রহণে প্রয়োজনীয় কর্মদিবস ব্যাপক হ্রাসের কথা বলা হয়েছে। এই প্রস্তাবনা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ হ্রাস এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক একাডেমিক কার্যক্রম সচল রাখার ওপর জোর দিয়েছে।
কেন এই সংস্কার? বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষা প্রায় দেড় থেকে দুই মাস ধরে চলে। এইচএসসি পরীক্ষাও দুই মাসের বেশি সময় নয়। এত দিন পরীক্ষা চললে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপ পড়ে। স্কুল-কলেজগুলোতে স্বাভাবিক পাঠদান ব্যাহত হয়। পরীক্ষার মৌসুমে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্লাস বন্ধ থাকে, নতুন সেশন শুরু হতে বিলম্ব হয়। এ সমস্যার সমাধানেই এই সংস্কার উদ্যোগ।
বিষয় সংখ্যা কমবে কতটুকু?
বর্তমানে এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের ১০-১২টি বিষয়ে পরীক্ষা দিতে হয়। এইচএসসিতেও বিষয় সংখ্যা প্রায় একই। নতুন প্রস্তাবনায় বিষয় সংখ্যা যৌক্তিক করে আনার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ, ঐচ্ছিক বিষয় কমিয়ে আনা এবং একই ধরনের বিষয়গুলো একত্রিত করার প্রস্তাব রয়েছে। এতে পরীক্ষার দিনসংখ্যাও স্বাভাবিকভাবে কমে আসবে।
পরীক্ষার সময়কাল কমানোর লক্ষ্য
সংস্কারের মূল লক্ষ্য হলো— এসএসসি পরীক্ষা যেন এক মাসের মধ্যে শেষ করা যায়। এইচএসসি পরীক্ষাও সর্বোচ্চ দেড় মাসের মধ্যে সম্পন্ন করা। বর্তমানে পরীক্ষা শুরু থেকে ফলাফল প্রকাশ পর্যন্ত প্রায় ছয় থেকে সাত মাস সময় লাগে। এই সময় কমানোর পরিকল্পনাও এই অ্যাকশন প্ল্যানে রয়েছে।
শিক্ষামন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রস্তাবনাটি অনুমোদন পেলে আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকেই নতুন ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত শিক্ষামন্ত্রীর অনুমোদনের পরই নেওয়া হবে।
এইচএসসি ২০২৬ পরীক্ষা: আগামী ২ জুলাই শুরু
এদিকে, এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষা ২০২৬ আগামী ২ জুলাই থেকে শুরু হবে। তাত্ত্বিক বা লিখিত পরীক্ষা ৮ আগস্ট পর্যন্ত চলবে। ব্যবহারিক পরীক্ষা ১১ থেকে ২১ আগস্ট পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হবে। সকল শিক্ষা বোর্ডের রুটিন এপ্রিল ২০২৬-এ প্রকাশ পেয়েছে।
এসএসসি ২০২৬ পরীক্ষা ইতিমধ্যে ২১ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে মে মাসে শেষ হয়েছে। ব্যবহারিক পরীক্ষাগুলো জুনের মাঝামাঝি পর্যন্ত চলেছে।
শিক্ষাক্রম সংস্কারের প্রেক্ষাপট
বিগত কয়েক বছর ধরে শিক্ষাক্রম সংস্কারের দাবি উঠছিল। কোভিড-১৯ মহামারির সময় সংক্ষিপ্ত সিলেবাসে পরীক্ষা হলেও পরবর্তীতে পুনরায় পূর্ণ সিলেবাস ফিরিয়ে আনা হয়। এনসিটিবি ২০২৬ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার জন্য সংশোধিত পুনর্বিন্যাসকৃত পাঠ্যসূচি ও প্রশ্নের ধরন প্রকাশ করেছে। পঞ্চম থেকে দশম শ্রেণিতেও পরিমার্জিত পাঠ্যক্রম চালু হয়েছে।
শিক্ষাবিদরা বলছেন, পরীক্ষার বিষয় ও সময় কমানো শিক্ষার মান হ্রাস করবে না। বরং এতে শিক্ষার্থীরা কম বিষয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করতে পারবে। বিশ্বের অনেক দেশেই পাবলিক পরীক্ষায় বিষয় সংখ্যা কম। বাংলাদেশেও এই মডেল কার্যকর করা সম্ভব।
সংস্কার বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ
তবে সংস্কার বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিষয় কমানোর সিদ্ধান্তে কোন বিষয়গুলো বাদ যাবে— তা নিয়ে বিতর্ক হতে পারে। ভর্তি পরীক্ষার সাথে সমন্বয় করাও জটিল। শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ ও পাঠ্যপুস্তক সংশোধনে সময় লাগবে।
শিক্ষামন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, কনসেপ্ট পেপারটি শিক্ষাবিদ, শিক্ষক প্রতিনিধি ও বোর্ড কর্মকর্তাদের মতামত নিয়ে তৈরি। আগামী কয়েক সপ্তাহে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভায় এটি আলোচনার জন্য উপস্থাপন করা হবে।
শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রতিক্রিয়া
খবরটি প্রকাশের পর থেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা আনন্দ প্রকাশ করছেন। অনেকেই বলছেন, এই সংস্কার হলে শিক্ষার্থীদের ওপর থেকে অযাথ চাপ কমবে। পরীক্ষার দিন কমলে পড়াশোনার সময় বাড়বে। স্কুল-কলেজে নতুন সেশনও সময়মতো শুরু করা যাবে।
তবে কেউ কেউ সনিদ্ধাশ প্রকাশ করছেন। বিষয় কমলে কি শিক্ষার পরিধি সংকুচিত হবে? পরীক্ষার প্রস্তুতি কি পর্যাপ্ত হবে? এ প্রশ্নগুলোর জবাব সংস্কার বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করবে।
উপসংহার
এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা সংস্কারের এই উদ্যোগ বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার জন্য একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক একাডেমিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্য অভিনন্দনযোগ্য। এখন দেখার বিষয়— কনসেপ্ট পেপারটি কত দ্রুত অনুমোদন পায় এবং সংস্কার কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয়।
সূত্র: বিএসএস, দ্য ডেইলি স্টার, কালের কণ্ঠ, ঢাকা ট্রিবিউন, ইত্তেফাক — ৬ জুন ২০২৬


