শিক্ষার্থী সংকটে ১৪৭ কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধের নির্দেশ

দেশের কারিগরি শিক্ষা খাত বড় ধরনের সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। শিক্ষার্থী না থাকায় ১৪৭টি কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঠদান বন্ধের নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা বোর্ড (বিটিইবি)। ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানে আর নতুন করে ভর্তি কার্যক্রম চলবে না।

কেন এমন সিদ্ধান্ত? প্রতিষ্ঠানগুলোয় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমশ কমছে। ডিপ্লোমা ইন ইঞ্জিনিয়ারিং, ডিপ্লোমা ইন ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্টসহ বিভিন্ন কোর্সে আসন শূন্য পড়ে রয়েছে। অথচ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের জন্য নির্ধারিত আছে ন্যূনতম শিক্ষার্থীসংখ্যা। সেই সীমার অনেক নিচে নেমে গেছে অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান।

বিটিইবির চিঠিতে কী বলা হয়েছে? সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষদের কাছে পাঠানো ওই চিঠিতে শিক্ষার্থী সংকটের কারণ ব্যাখ্যা করতে বলা হয়েছে। কেন প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ভর্তি হচ্ছে না—তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ চেয়েছে বোর্ড। ৩০ দিনের মধ্যে জবাব না দিলে একতরফাভাবে প্রতিষ্ঠানটির ভর্তি কার্যক্রম স্থগিত করা হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।

কারিগরি শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানই গ্রামীণ এলাকায়। সেখানে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার ব্যাপারে সচেতনতার অভাব রয়েছে। আবার অনেক প্রতিষ্ঠানে মানসম্মত শিক্ষার পরিবেশ নেই, যা শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমিয়ে দিচ্ছে। অত্যাধুনিক সরঞ্জামের অভাবে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনও কঠিন হয়ে পড়ছে।

শুধু কি ১৪৭টি প্রতিষ্ঠান? না, এর চেয়েও বেশি প্রতিষ্ঠান ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বোর্ডের তথ্যমতে, ডিপ্লোমা পর্যায়ে মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৬০০। তার মধ্যে কমপক্ষে ২০০টি প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমেছে। আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের ভর্তি কার্যক্রম বন্ধের প্রক্রিয়া চলছে বলে জানিয়েছেন বোর্ডের এক কর্মকর্তা।

এ অবস্থায় কী করছে সরকার? কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর ইতিমধ্যে বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির তথ্য অন্তর্ভুক্তির সময় বাড়ানো হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পখাতের সঙ্গে সমন্বয় করে দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ চালুর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়—প্রতিষ্ঠানগুলোকেও নিজেদের মান উন্নত করতে হবে।

অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে কারিগরি শিক্ষার প্রতি অনীহার পেছনে রয়েছে নানা কারণ। অনেকে মনে করেন, কারিগরি শিক্ষা নিলে চাকরির বাজার সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। দেশের তৈরি পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি ও নির্মাণ খাতে দক্ষ জনশক্তির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, আগামী পাঁচ বছরে কারিগরি শিক্ষিত জনশক্তির চাহিদা বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ৪০ শতাংশ।

শিক্ষার্থী সংকটের আরও একটি কারণ হলো—অনেক প্রতিষ্ঠানে কোর্স ফি তুলনামূলক বেশি। অথচ প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো ও শিক্ষার মান সেই অনুপাতে ভালো নয়। ফলে শিক্ষার্থীরা সাধারণ ধারার শিক্ষার প্রতিই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছে। বিশেষ করে এসএসসি ও এইচএসসি পাসের পর অনার্স বা ডিগ্রি কোর্সে ভর্তি হওয়াকেই তারা অধিক লাভজনক মনে করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই সমস্যার সমাধানে একসঙ্গে কাজ করতে হবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে। প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষক নিয়োগ, ল্যাবরেটরি আধুনিকীকরণ এবং শিল্প প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তিভিত্তিক দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষা চালু করা। একইসঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই।

প্রসঙ্গত, বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। সম্প্রতি শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে বিশ্ববাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার জন্য নতুন শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে কারিগরি শিক্ষাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। আশা করা যায়, সরকারের এসব উদ্যোগ শিক্ষার্থী সংকট কাটিয়ে উঠতে সহায়ক হবে।

Comments

No comments yet. Why don’t you start the discussion?

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *