
বাংলাদেশ আবার আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে শিক্ষায় অনন্য কৃতিত্ব দেখিয়েছে।
১০ জুন ২০২৬ তারিখে ইউনেস্কো ঢাকা আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সিধুলাই স্বনির্বর সংস্থা-কে ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার ২০২৫ প্রদান করা হয়েছে। এই পুরস্কারের মূল্যায়ন সেই অসাধারণ ভাসমান স্কুল প্রকল্প, যা চালান বিলের স্থানকান্নায়-সমৃদ্ধ জলাভূমি এলাকায় বসবাসকারী শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষার আলো পৌঁছে দিয়েছে।
ভাসমান স্কুল কী এবং কেন এত বিশেষ?
বাংলাদেশ একটি নদীমাতৃক দেশ। প্রতি বছর বন্যার কারণে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী মাসের পর মাস স্কুল থেকে বঞ্চিত হয়। রাজশাহী, কুমিল্লা, সিলেট এবং উত্তরবঙ্গের হাওর অঞ্চলে মৌসুমী বন্যা ও জলাবদ্ধতা শিক্ষাব্যবস্থাকে আক্রান্ত করেছে দীর্ঘদিন। এই সমস্যা সমাধানের জন্য বাংলাদেশী স্থপতি মোহাম্মদ রেজওয়ান এই ভাসমান স্কুলের ধারণাটি বাস্তবায়ন করছেন।
এই স্কুলগুলো আসলে সোলার পাওয়ারচালিত নৌকা যা শিক্ষা-উপকরণ, ইন্টারনেট সুবিধা এবং ডিজিটাল শিক্ষা প্রযুক্তি দিয়ে সজ্জিত। বন্যাকালে যখন সাধারণ স্কুলগুলো ডুবে যায়, তখন এই ভাসমান স্কুল শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ায়। প্রতিটি স্কুলের মধ্যে শোনার জায়গা আছে, পাঠ্যপুস্তক আছে, আর সোলার প্যানেল দিয়ে আলো ও বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা চলে। শিক্ষার্থীরা নৌকায় বসে পড়াশোনা করতে পারে — চারদিকে জল থাকা সত্ত্বেও।
তারিখের সুতোয় পথচিহ্ন: কবে থেকে কী হলো
সিধুলাই স্বনির্বর সংস্থার এই ভাসমান স্কুল প্রকল্প শুরু হয়েছিল বহু বছর আগে, যখন মোহাম্মদ রেজওয়ান লক্ষ্য করলেন যে তাঁর নিজের এলাকার বাচ্চারা বন্যা মৌসুমে পুরো সেপ্টেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত স্কুলে আসতে পারে না। তিনি ভাবলেন — যদি বাচ্চারা স্কুলে না আসে, তাহলে স্কুলকেই তাদের কাছে নিয়ে যাওয়া যায়। এই চিন্তা থেকেই ভাসমান স্কুলের যাত্রা শুরু।
প্রথমে একটি নৌকা দিয়ে শুরু হওয়া এই প্রকল্প এখন চালান বিল এলাকায় বেশ কয়েকটি জেলায় বিস্তৃত হয়েছে। ইউনেস্কো এর প্রভাব ও অবদান স্বীকার করে এই বছর কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার দিয়ে সম্মানিত করেছে। এই পুরস্কার প্রদান করা হয় ১০ জুন ২০২৬ তারিখে ইউনেস্কোর ঢাকা অফিসে আয়োজিত এক বিশেষ অনুষ্ঠানে।
এই পুরস্কারের তাৎপর্য কী?
ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার বিশ্বের সাক্ষরতা ক্ষেত্রে সবচেয়ে সম্মানজনক পুরস্কারগুলোর একটি। এটি মূলত গ্রামীণ এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতা কার্যক্রমে বিশেষ অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের প্রদান করা হয়। বাংলাদেশের একটি স্থানীয় সংস্থা এই পুরস্কার পেয়েছে — যা নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়।
এটা শুধু সিধুলাই স্বনির্বর সংস্থার জয় নয়, এটা বাংলাদেশের সমগ্র শিক্ষা ব্যবস্থার জয়। এই পুরস্কার প্রমাণ করে যে বাংলাদেশ শিক্ষা ক্ষেত্রে উদ্ভাবনী পদ্ধতি অবলম্বনে এগিয়ে যেতে পারে। বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বন্যা ও জলাবদ্ধতা বাড়ছে — এমন পরিস্থিতিতে ভাসমান স্কুল মডেলটি শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, বিশ্বের অন্যান্য বন্যাপ্রবণ দেশের জন্যও অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।
চালান বিলের শিক্ষার্থীদের জীবনে পরিবর্তন
চালান বিল বাংলাদেশের একটি বিশাল স্থানকান্নায়-সমৃদ্ধ জলাভূমি এলাকা। এখানে বসবাসকারী মানুষের জীবন মূলত জলের ওপর নির্ভরশীল। বন্যাকালে এলাকার স্কুলগুলো পানিতে তলিয়ে যায়, রাস্তাঘাট বন্ধ হয়ে যায়, এবং শিক্ষার্থীরা মাসের পর মাস পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত হয়। এই সমস্যার সমাধান হিসেবে ভাসমান স্কুল এখানে একটি নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
সোলার পাওয়ারচালিত এই স্কুলগুলোতে শুধু পড়াশোনাই হয় না, বরং এখানে ডিজিটাল সাক্ষরতা, পরিবেশ শিক্ষা এবং জলবায়ু সচেতনতার বিষয়ও শেখানো হয়। শিক্ষার্থীরা নৌকায় বসে কম্পিউটার চালানো শিখছে, ইন্টারনেট ব্যবহার করছে এবং আধুনিক শিক্ষা প্রযুক্তির সাথে পরিচিত হচ্ছে।
শিক্ষা খাতে এই পুরস্কারের বড় চিত্র
বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে সাম্প্রতিকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন ঘটেছে। ইউনেস্কোর গ্লোবাল এডুকেশন মনিটরিং রিপোর্ড অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্তির হার ১৯৯০ সালের ৩৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৯০ শতাংশ হয়েছে। এই অসাধারণ অগ্রগতির পেছনে বিভিন্ন উদ্ভাবনী প্রকল্প এবং সরকারি-বেসরকারি প্রচেষ্টা কাজ করেছে।
ভাসমান স্কুল পুরস্কার এই অগ্রগতির একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে। এটি দেখায় যে বাংলাদেশ শুধু শিক্ষার হার বাড়াতে পারে না, বরং পরিস্থিতি অনুযায়ী শিক্ষা পদ্ধতি নতুন করে চিন্তাও করতে পারে।
উপসংহার
সিধুলাই স্বনির্বর সংস্থার ভাসমান স্কুল প্রকল্প ইউনেস্কো কনফুসিয়াস সাক্ষরতা পুরস্কার জেতা — এটি বাংলাদেশের শিক্ষা ইতিহাসে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। এই পুরস্কার আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে সমস্যা কতটা বড়ই না কেন, সৃজনশীল চিন্তা ও নিঃস্বার্থ পরিশ্রমের মাধ্যমে তার সমাধান বের করা সম্ভব। চালান বিলের সেই শিক্ষার্থীরা, যারা একসময় বন্যার কারণে স্কুল থেকে বঞ্চিত হতো, আজ তারা ভাসমান স্কুলে পড়ছে — এটাই সবচেয়ে বড় সাফল্য।
আশা করি, এই পুরস্কার বাংলাদেশের শিক্ষা খাতে আরও বেশি উদ্ভাবনী প্রকল্পের জন্ম দেবে এবং প্রতিটি শিক্ষার্থী তার শিক্ষার অধিকার পাবে — তার বাসস্থান যতই দূর্গম বা জলময় হোক না কেন।


